রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০   কার্তিক ৯ ১৪২৭   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কক্সবাজার বার্তা
সর্বশেষ:
৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ‘২০৪১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে সাড়ে ১২ হাজার ডলার’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে অ্যাঞ্জেলিনার চিঠি ডিসেম্বরে নির্মাণ শুরু হবে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রুট গোলদিঘির পাড়ে নির্মিত হচ্ছে আধুনিকমানের মারকাজ মসজিদ ২০২২ সালের মধ্যে ট্রেন চলবে কক্সবাজারে কক্সবাজারের উন্নয়নে উদ্যোগ নিলো জাতিসংঘ দ্বিতীয় পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প মহেশখালী-কুতুবদিয়ায়! এগিয়ে চলছে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ ১০০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে কক্সবাজারে ২৫ মেগা প্রকল্পে পাল্টে যাচ্ছে কক্সবাজার উন্নয়নে শীর্ষে কক্সবাজার
৩৮৭

চট্টগ্রাম কলেজ:  গৌরবের ১৫০ বছর  

প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০১৯  

দেশের ঐতিহ্যবাহী ও সুপ্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি চট্টগ্রাম কলেজ। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২০১৯ সালে এ কলেজ পদার্পণ করেছে ১৫০ বছরে। 
বন্দর নগরী চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র চকবাজার এলাকার কলেজ রোডে প্রায় ২০ একর পাহাড়ি টিলা ও সমতল ভূমির ওপর কলেজটির অবস্থান। 
গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য নিয়ে ১৫০ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠান জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। পেয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চারবার দেশসেরা কলেজের স্বীকৃতি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর এর কর্মপরিধি বেড়েছে কয়েকগুণ।

চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল হাসান বলেন, আমি নিজেও এ কলেজের ছাত্র ছিলাম। এ কলেজের ছাত্র হয়ে আমি নিজেই গর্ববোধ করি। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়ন করেছে আমার পরিবারে চার প্রজন্ম। এ কলেজে আমি পড়েছি, আমার মেয়ে পড়েছে, আমার বাবা ও দাদা পড়েছে।

তিনি আরো জানান, কলেজের ১৫০ বছর ফূর্তি উপলক্ষে কলেজের নবীন-প্রবীণদের নিয়ে একটি মিলন মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সার্ধশত বছরের স্মৃতি নিয়ে এ্যালবাম ‘আয়না’ ও ম্যাগজিন ‘সোনালী ঐতিহ্য’র কাজ শেষ পর্যায়ে।

জানা যায়, ১৮৩৪ সালে উপমহাদেশে লর্ড বেন্টিং এর শাসনকালে টমাস বেবিংটন মেকলকে সভাপতি করে গঠন করা হয় ‘জনশিক্ষা সাধারণ কমিটি’। এ কমিটির সুপারিশে ১৮৩৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম জেলা স্কুল। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর ১৮৬৯ সালে এফএ (বর্তমান উচ্চমাধ্যমিক) ক্লাস চালুর মধ্য দিয়ে এ স্কুলকে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। তখন থেকেই চট্টগ্রাম কলেজ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায় কলেজটি। 


পুর্তগীজ আমলের এক ভবনে শুরু হয় ক্লাস। কিন্তু বছর না পেরোতেই তীব্র অর্থ সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় কলেজ । এগিয়ে আসেন মিরসরাইয়ের ধুম নিবাসী জমিদার রায় বাহাদুর গোলকচন্দ্র রায়। 

তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারের একান্ত সচিব কবি নবীন চন্দ্র সেনের অনুরোধে তিনি ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। তার এ অনুদানে ১৮৭১ সালে কলেজটি যেন প্রাণ ফিরে পেল। কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন জে সি বোস। ১৯০৯ সালে এই কলেজে কলা বিভাগের পাশাপাশি বিজ্ঞান পড়ানো শুরু হয়।

চট্টগ্রাম জিলা স্কুলকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে ১৯১০ সালে কলকতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটিকে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রী কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 
শুরুতে স্নাতক পর্যায়ে গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞান পড়ানো হতো। ১৯১৯ সালে স্নাতক শ্রেণীর বিষয় হিসেবে ইংরেজী এবং সম্পূরক শ্রেণীতে দর্শন ও অর্থনীতি যুক্ত হয়। 

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এ কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত হয়।


১৯২৪ সালে কলেজে প্রথম মুসলিম প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন আহমদ। তাঁর সময়কালে প্রথম বারের মতো ছাত্রী ভর্তির মাধ্যমে শুরু হয় সহশিক্ষা কার্যক্রম, নেয়া হয় কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ।
শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ১৯২৬ সালে মুসলিম ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কলেজের অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে বাড়ে পরিসর। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, বিজ্ঞান গবেষণাগারের উন্নয়নসহ পদার্থ,রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিভাগের জন্য আলাদা ভবন নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ করা হয় ছাত্রাবাস।

১৯৫৫ সালে স্নাতক শ্রেণির সব বিষয় প্রত্যাহার করা হলেও ১৯৬০ সাল থেকে বাংলা, ইংরেজী, অর্থনীতি, গণিত, পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণি নব উদ্যমে চালু হয় । ১৯৬২ সালে যোগ হয় পরিসংখ্যান, প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার স্নাতক (সম্মান) কোর্স। 
বর্তমানে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিকের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৭টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৮ টি বিষয়ে স্নাতকোত্তরসহ ডিগ্রী (পাস) কোর্স চালু রয়েছে। 

বর্তমানে এ কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। শিক্ষক রয়েছেন ১৫৭ জন আর কর্মকর্তা কর্মচারীর সংখ্যা দেড় শ’র উপরে।


 
শুধু শিক্ষার দ্যোতি ছড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি চট্টগ্রাম কলেজ। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামসহ জাতির যে কোন ক্রান্তিলগ্নে এ কলেজের ছাত্র-শিক্ষকেরা ছিলেন সামনের সারিতে। 

কলেজের শিক্ষার্থী কবি মাহবুবুল আলম, শামসুদ্দিন মোহাম্মদ ইসহাক, এজহারুল হক, প্রতিভা মুৎসুদ্দী প্রমুখেরা ভাষা আন্দোলনে অনন্য অবদান রাখেন।

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ কলেজের প্যারেড মাঠে উত্তোলন করা স্বাধীন বাংলার পতাকা এবং পরিবেশিত হয় নাটক ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’। 
মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন কলেজের দর্শন বিভাগের শিক্ষক অবনী মোহন দত্ত, ছাত্রনেতা আব্দুর রব, মিয়া শাহজান কবির ও মুরিদুল আলম প্রমুখ।

এছাড়া ৬৯-এর অভ্যুত্থান এবং ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে এ কলেজের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সার্ধশত বছরের পথচলায় এ কলেজ শিক্ষক হিসেবে দেশবরেণ্য অনেক গুণী মানুষকে পাশে পেয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবুল ফজল, এ ডব্লিউ মাহমুদ, দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, অধ্যাপক মোতাহের হোসেন চৌধুরী,
অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদ, অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ, ড. জনার্দন চক্রবর্তী প্রমুখ।

এ কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থী জাতীয় পর্যায়ে তো বটে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে যাচ্ছে। 


 
সাহিত্য বিশারদ আবদুল করিম, ভাষা বিজ্ঞানী ড. এনামুল হক, বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক আবদুল্লাহ আল মুতী, ড. আহমদ শরিফ, অধ্যাপক ড. আবদু্ল্লাহ মো. সিরাজ উদ্দীন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস, ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসির মামুন, প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেনের মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিরা এ কলেজের ছাত্র ছিলেন।

চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নাদিয়া সুলতানা বলেন, নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসসহ বহু খ্যাতিমান মানুষের স্মৃতি বিজড়িত এ কলেজের ছাত্রী হিসেবে গর্ববোধ করি। চলে যাবার পর খুব মিস করব নৈসর্গিক এ ক্যাম্পাসকে। 

কক্সবাজার বার্তা
কক্সবাজার বার্তা