শনিবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২০   অগ্রাহায়ণ ২১ ১৪২৭   ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

কক্সবাজার বার্তা
সর্বশেষ:
৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ‘২০৪১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে সাড়ে ১২ হাজার ডলার’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে অ্যাঞ্জেলিনার চিঠি ডিসেম্বরে নির্মাণ শুরু হবে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রুট গোলদিঘির পাড়ে নির্মিত হচ্ছে আধুনিকমানের মারকাজ মসজিদ ২০২২ সালের মধ্যে ট্রেন চলবে কক্সবাজারে কক্সবাজারের উন্নয়নে উদ্যোগ নিলো জাতিসংঘ দ্বিতীয় পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প মহেশখালী-কুতুবদিয়ায়! এগিয়ে চলছে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ ১০০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে কক্সবাজারে ২৫ মেগা প্রকল্পে পাল্টে যাচ্ছে কক্সবাজার উন্নয়নে শীর্ষে কক্সবাজার
৫৫

পর্যটন শিল্পের বহুমাত্রিক উদ্যোগে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২০  

পর্যটন হলো একটি বহুমাত্রিক শ্রমঘন শিল্প। এ শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি অনুদান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয়সাধন করার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা দরকার পর্যটনের জন্য। পর্যটনশিল্পের উপাদান ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটানো সম্ভব।

ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে শুধু এ খাতে প্রত্যক্ষভাবেই ১২ লাখ ৫৭ হাজার লোক কাজ করবে।এ লক্ষ্যে পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথমবারের মতো সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে ২৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোতে প্রায় প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ হবে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

টেকনাফ এলাকায় তৈরি হচ্ছে ইকো ট্যুরিজম পার্ক। নাফ নদের মাঝে একটি চরকে গড়ে তোলা হচ্ছে পর্যটন এলাকা হিসেবে। মহেশখালীকে পাওয়ার হাব হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। শুধু মহেশখালীতেই বিনিয়োগ হচ্ছে লাখো কোটি টাকা। সোনাদিয়া দ্বীপে অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কুতুবদিয়া দ্বীপে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এটি দেখতে অনেক পর্যটক সেখানে যান। এ কারণে একে আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

জানা যায়, কক্সবাজার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নের জন্য ৭টি প্রকল্প নির্ধারিত করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও বন্দরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ প্রকল্প। খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড় বেঁধে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ অন্যতম। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে পর্যটননগর কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার। প্রতি বছরে এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। এসব স্থানে প্রায় ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ বিশেষ করে নাফ ট্যুরিজম পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা পর্যটন বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে। কারণ এতে বিনিয়োগ করছে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত কোম্পানি সিয়াম সিয়াম ইন্টারন্যাশনাল। প্রাথমিকভাবে কোম্পানিটি ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। ২৭১ একর জায়গাজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি ১২ হাজারের বেশি লোকের কর্মসংস্থান জোগাবে। এ নাফ ট্যুরিজম পার্ক উন্নয়নের প্রকল্প ব্যয় ১৭০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) নাফ ট্যুরিজম পার্কের উন্নয়ন কাজ হাতে নিয়েছে।

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রথম পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে যাচ্ছে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক। কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং সমুদ্রতীরে এই পর্যটন অঞ্চল গড়ে উঠছে। পরিকল্পিত এই আধুনিক পর্যটন পার্কে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে বেশ কিছু কোম্পানির বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এগুলো পর্যালোচনা করে ইতোমধ্যে ১২টি কোম্পানির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে বেজার নির্বাহী বোর্ড। কোম্পানিগুলো পার্কের মধ্যে তারকা হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করবে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ২৪ কোটি ডলার বা ২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ১ হাজার ৪৭ একর আয়তনের এ পার্কে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রেখে অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়া ১২ কোম্পানি ১১৬ একর জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করবে। এতে ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। ১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি বিদেশি কোম্পানি আছে। সিঙ্গাপুরের ইন্টার এশিয়া গ্রুপ ৮৩ একর জমিতে ৯ কোটি ডলার বিনিয়োগে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট করবে। এতে প্রায় ৬ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। অন্যদিকে সোনাদিয়া ইকো ট্যুরজম পার্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে বেজা সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে।

নীল দিগন্ত নামে খ্যাত বান্দরবানের থানচির পাহাড়চূড়ায় একটি নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বর্ষায় মেঘের লুকোচুরি ও খেলা পর্যটকদের মায়া কাড়বে নিঃসন্দেহে। দ্বীপের রানী ভোলা ব্র্যান্ডকে পর্যটকদের কাছে পৌঁছে দিতে এরই অংশ হিসেবে ভোলার পর্যটনদ্বীপ কুকরীমুকরীকে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে। তাছাড়াও বর্তমান সরকার পর্যটনকে আরও আধুনিকভাবে সাজানোর জন্য জেলাভিত্তিক পর্যটন কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে আরও আধুনিক করা হচ্ছে।

বর্তমান বছরগুলোয় সরকারসহ বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যটনকে অর্থনৈতিক একটি কার্যকর খাত হিসেবে রূপান্তরে সচেষ্ট হয়েছে। তাই পর্যটনশিল্পের বিকাশে গবেষণাধর্মী কর্মকাণ্ড বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পর্যটনের ওপর উচ্চশিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থাসহ বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত অনুমোদন দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে জনশক্তি তৈরিতে কাজ করছে। দক্ষ পর্যটনকর্মী গড়ে তুলতে পর্যটন করপোরেশন পরিচালিত ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ঢাকা অফিসের বাইরে বরিশাল ও কক্সবাজারে দুটি নতুন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে ট্যুর অপারেটর আইন, পর্যটন করপোরেশন আইন, পর্যটক পরিসংখ্যান তৈরির অনলাইন পদ্ধতিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় পর্যটনশিল্পের সংযোজন শুধু আর্থিক সাফল্য বয়ে আনবে না, সেই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে এর সুফল ছড়িয়ে দেবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে অন্যতম হাতিয়ার। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় পর্যটনশিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

লেখক :
ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া।
অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কক্সবাজার বার্তা
কক্সবাজার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর