বুধবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২০   অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৭   ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

কক্সবাজার বার্তা
সর্বশেষ:
৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ‘২০৪১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে সাড়ে ১২ হাজার ডলার’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে অ্যাঞ্জেলিনার চিঠি ডিসেম্বরে নির্মাণ শুরু হবে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রুট গোলদিঘির পাড়ে নির্মিত হচ্ছে আধুনিকমানের মারকাজ মসজিদ ২০২২ সালের মধ্যে ট্রেন চলবে কক্সবাজারে কক্সবাজারের উন্নয়নে উদ্যোগ নিলো জাতিসংঘ দ্বিতীয় পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প মহেশখালী-কুতুবদিয়ায়! এগিয়ে চলছে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ কাজ ১০০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলছে কক্সবাজারে ২৫ মেগা প্রকল্পে পাল্টে যাচ্ছে কক্সবাজার উন্নয়নে শীর্ষে কক্সবাজার
১৪৩

মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০২০  

বঙ্গোসাগরের তীরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর’ বাস্তবায়নে প্রথম ধাপের কাজ শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে এই বন্দরে জাহাজ ভিড়বে এবং কনটেইনার ওঠানামা করবে। গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একইসঙ্গে পার্শ্ববর্তী স্থলবেস্টিত দেশের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর এই সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য জাপানের নিপ্পন কোই নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে জাপানের আরও দু’টি এবং একটি দেশীয়সহ মোট চারটি প্রতিষ্ঠান কাজ করবে। তিনটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে— জাপান পোর্ট কনসালট্যান্ট, সিডিআই ও ডিডিসি। তাদের মাধ্যমে নকশা প্রণয়ন, সুপারভিশন, মনিটরিং, টেন্ডার অ্যাসিস্ট্যান্সসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

চুক্তি সইয়ের পর কাজ শুরুর সব প্রস্তুতি শেষ করে সোমবার (১৬ নভেম্বর) নিপ্পন কোই’র প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন নিপ্পন কোই’র টিম লিডার মি. হোতানি।

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে যেভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা প্রায় শেষপর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। নদীভিত্তিক বন্দরের ওপর আমাদের দেশের অর্থনীতি আর পুরোপুরি নির্ভর করার অবস্থায় নেই। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর— এটি এখন সময়ের দাবি। জাইকার অর্থায়নে আমরা নিপ্পন কোইকে কনসালট্যান্ট ফার্ম হিসেবে নিয়োগ করেছি। আমরা বলছি যে আজ (সোমবার) থেকেই মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ অফিশিয়ালি শুরু হলো।’

মাস্টারপ্ল্যান তৈরির প্রায় পাঁচ বছর পর আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে সেই পরিকল্পনা সংশোধন করে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বন্দর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ১০ মার্চ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদন পায়।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে অন্তত ১৫ মিটার গভীরতা বা ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে। প্রতিটি জাহাজ আট হাজারের বেশি কনটেইনার নিয়ে জেটিতে ভিড়তে পারবে। অথচ গভীরতা কম হওয়ায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে মাত্র ৯ মিটার ড্রাফটের নিচের জাহাজ ভিড়তে পারে। ৯ মিটারের কম ড্রাফটের জাহাজে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার পরিবহন সম্ভব নয়।

এ বাস্তবতায় মাতারবাড়ি বন্দর ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী হবে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘যে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে ফিরে যেতে ১৫ দিন লাগে, সেটা পাঁচ দিনের মধ্যেই অনায়াসে মাতারবাড়িতে চলে যেতে পারবে। তাহলে ব্যবসায়ীদের কস্ট (খরচ) কম হবে এবং তারা আকৃষ্ট হবেন।’

বন্দরের চেয়ারম্যান জানান, প্রাক-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একবছরের মধ্যে মূল নির্মাণ কাজ শুরু হবে। দুই ধাপে বন্দর নির্মাণের কার্যক্রম চলবে। একটি কনটেইনার টার্মিনাল ও একটি বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ হবে প্রথমে। এরপর চাহিদার ভিত্তিতে টার্মিনাল আরও বাড়ানো হবে। ২০২৬ সালে কাজ শেষে মাতারবাড়ি বন্দরে অপারেশন শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এই মাতারবাড়ি বন্দর। ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক বেল্ট গড়ে উঠছে, তাতে এই বন্দর এই অঞ্চল তথা দেশের, বঙ্গোপসাগরে আমাদের অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আর আমাদের যে সুনীল অর্থনীতির কাজ শুরু হয়েছে, এই বন্দরের মাধ্যমে আরও বেগবান হবে।’

‘আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার গ্রোথ হচ্ছে অ্যাভারেজে ৮ থেকে ১০ শতাংশ। আমরা এখন ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারি। ২০৩৬ সালে আমাদের ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন টিইউস হ্যান্ডলিং করতে হবে। এই যে ট্রেড বাড়ছে, এটা সামলানোর জন্যই আমাদের আরেকটা পোর্ট দরকার। ২০২৬ সালে মাতারবাড়ি বন্দর চালুর পর সেখানে ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে,’— বলেন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ।

মহেশখালীর মাতারবাড়িকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে জাপানের কোয়ালিটি অক্ষুণ্ন রেখে বন্দরের নকশা প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সদস্য জাফর আলম। তিনি বলেন, ‘বাস্তবায়নের কাজটা যত কম সময়ের মধ্যে করা যায়, আমরা সেই চেষ্টা করব। ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতেই এই টার্মিনালের কার্যক্রম ‍শুরু হতে পারে। যেহেতু রোড নেটওয়ার্কের একটি বিষয় এটার সঙ্গে যুক্ত, সে কারণে ২০২৬ সালের কথা বলা হয়েছে।’

বন্দরের সঙ্গে ২৬ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্কের কাজও একইসঙ্গে শেষ হবে বলে জাফর আলম জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের মধ্যেই রোড নেটওয়ার্কটা হয়ে যাবে। রেল নেটওয়ার্কের বিষয়টা এডিবি ফিজিবিলিটি স্টাডি করছে। সেটা করতে হয়তো আরও ২-৩ বছর লাগবে।’

প্রাথমিকভাবে মাতারবাড়ি বন্দরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য চাহিদা কম থাকবে ধরে নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে জাফর আলম বলেন, ‘একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে এই জায়গাটি (মাতারবাড়ি) নদীপথে সংযুক্ত আছে, কিন্তু সড়ক ও রেলপথে যুক্ত নেই। সেজন্য প্রাথমিকভাবে ডিমান্ড কম হবে ধরে নিয়েই তারা (জাইকা) ক্যালকুলেট করেছে। যত বিনিয়োগ করলে সেটা উঠে আসবে, সেভাবেই করা হচ্ছে। পরে ব্যবসা বাড়লে ধাপে ধাপে হবে।’

জাফর আলম আরও জানিয়েছেন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। ২৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণও এই ব্যয়ে সংযুক্ত। শুধু সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা।

‘গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য ফিজিব্যালিটি ও প্রি-ফ্যাজিবিলিটি স্টাডির জন্য আমাদের কোনো টাকা খরচ হয়নি। এটা জাপানের তরফে খরচ হয়েছে। কিন্তু কনসালট্যান্সির জন্য আমাদের খরচ হচ্ছে ২৩০ কোটি টাকা। সরকার শূন্য দশমিক এক শতাংশ সুদে জাইকা থেকে ঋণ নিয়েছে। সহজ শর্তের এই ঋণ ২০ বছর পর পরিশোধ করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করছে। এটা জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় করা হচ্ছে,’— বলছেন জাফর আলম।

তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮৮ একর জমি প্রথম ধাপের জন্য অধিগ্রহণের অনুমোদন দিয়েছেন। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ কক্সবাজারে পৌঁছেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকাটা হস্তান্তর করবে। জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক কার্যক্রম এর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আপনারা যদি শ্রীলঙ্কা, জাপান, থাইল্যান্ডের দিকে তাকান, তাহলে জানতে পারবেন একটি পোর্ট অথরিটির অধীনে আরও পোর্ট বা টার্মিনাল থাকতে পারে। কুতুবদিয়ায় এখন যে জাহাজগুলো অবস্থান করে, সেগুলো কিন্তু আমাদের পোর্ট এরিয়ার মধ্যেই। আমরা পোর্ট লিমিট সে পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেছি। মাতারবাড়িও আমাদের এরিয়ার মধ্যেই। এই মুহূর্তে নতুন কোনো পোর্ট অথরিটি করার পরিকল্পনা সরকারের নেই। চট্টগ্রাম থেকেই বন্দরটি পরিচালনা করলে অনেক ব্যয়সাশ্রয়ী হবে।’

নতুন বন্দর নির্মাণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জাফর আলম বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একেবারে ক্লিয়ার— নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিজেদের বন্দর তৈরি করা, নিজের ইকোনমির জন্য এবং পার্শ্ববর্তী দেশকে সহায়তা করার জন্য এই বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চারটি কনটেইনার দিয়ে যে ট্রানজিট ভারতে চালু হয়েছে, এটি একেবারে প্রাথমিক ব্যাপার। মাতারবাড়ির জন্য আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আশপাশের ল্যান্ডলকড কান্ট্রিগুলো অথবা যে স্টেটগুলো আছে, সেগুলোকে নিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের নিজের তাগিদেই তার ব্যবসা নির্ধারণ করবেন, দিকনির্দেশনা ঠিক করবেন। আমাদের কাজ হবে শুধু সুযোগটা সম্প্রসারণ করে দেওয়া।

কক্সবাজার বার্তা
কক্সবাজার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর