বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০   আশ্বিন ১৫ ১৪২৭   ১২ সফর ১৪৪২

যন্ত্রেই হবে চাষাবাদ, কৃষিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ সরকারের

কক্সবাজার বার্তা

প্রকাশিত : ১২:৪৬ এএম, ৩০ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার

বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে কৃষির উন্নয়নে বিশেষ নজর দিচ্ছে সরকার। খাদ্যের নিশ্চয়তা ধরে রাখতে আগামীর দিনগুলোতে কৃষিই একমাত্র ভরসার জায়গা। তাই কৃষির আধুনিকায়নসহ দেশের কৃষির ইতিহাসে কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। সরকারের এই উদ্যোগে দেশের কৃষির চালচিত্র বদলে যাবে বদলে ধারণা করছেন সংর্শ্লিষ্টরা।

নতুন বিনিয়োগ প্রকল্পে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ কারণে ভর্তুকি দিয়ে ৫১ হাজার ৩০০টি যন্ত্র কৃষকদের সরবরাহ করবে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষকরা অর্ধেকেরও কম মূল্যে পাবেন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র। এইসব যন্ত্রের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের মতো কম সময়ে জমি চাষ এবং ফসল সংগ্রহ করতে পারবেন কৃষক। এই প্রকল্পে সরকারের ব্যয় হবে তিন হাজার বিশ কোটি টাকা। যান্ত্রিকীকরণের ফলে কমে আসবে জমি চাষ ও ফসল সংগ্রহোত্তর অপচয়। চলতি বোরোতেও যন্ত্রের ব্যবহার সহায়ক ছিল খাদ্য নিরাপত্তায়। সারাদেশে কৃষকের শস্য বুনন-কর্তনে সময় বাঁচবে, তেমনি অর্থও সাশ্রয় হবে। এই কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে করোনায় কাজ হারানো অনেকের কর্মসংস্থানও হবে। আরও এগিয়ে যাবে কৃষি খাত। জানা গেছে, প্রত্যেক বছর আউশ, আমন, বোরো কিংবা গম, ভুট্টা উৎপাদনে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি উৎপাদন হয়। তবে উৎপাদিত শস্য সংগ্রহোত্তরকালে প্রায় বিশ শতাংশের কাছাকাছি অপচয় হয়। অথচ এই ফসল সঠিকভাবে ঘরে আসলে আরও বেশি মজবুত হতে পারে দেশের খাদ্যভা-ার। একই সঙ্গে মানব শক্তি বা প্রাণী শক্তি দিয়ে জমিতে চাষাবাদের ফলে একজন কৃষকের যে অর্থ খরচ হয় যন্ত্রের মাধ্যমে করলে অনেক কমে যায় এবং বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে অন্য ফসলসহ সারাবছর শাকসবজি আবাদ করতে পারেন। এতে কৃষকই লাভবান হবেন। তাই কৃষকদের লাভবান করতে এবং করোনা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নতুন উদ্যোগ হিসেবে সারাদেশে যান্ত্রিকীকরণ উদ্যোগ নিল সরকার। করোনার মধ্যেও কৃষিতে এই বড় বিনিয়োগ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনরা। চলতি বোরোতে হাওড়ের ধান যখন আগাম বন্যায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা যায় তখন সরকারের বিশেষ বরাদ্দ ও দেশের অন্যান্য স্থান থেকে আধুনিক যন্ত্র নেয়া হয় হাওড়ে। দ্রুত ধান কেটে তুলে দেয়া হয় কৃষকের গোলায়। আর এতে আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই মজবুত হয়। কিছুটা দুশ্চিন্তামুক্ত হয় সরকারও। করোনায় সবাই যখন ঘরবন্দী তখন সঠিকভাবে মাঠের ফসল ঘরে উঠাতে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল যন্ত্রগুলোর। ফলে আরও ব্যাপকভাবে যন্ত্রের ব্যবহার সামনে আসে। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণ করতে যান্ত্রিকীকরণের ওপর বার বার গুরুত্বারোপ করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ শীর্ষক একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। চলতি মাসেই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। চলতি সময় থেকে ২০২৫ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্প অনুমোদনের পর পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আমাদের এগিয়ে যেতে হলে কৃষিকে আধুনিক করতে হবে। উৎপাদন খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কৃষিকে ব্যবসায়িকভাবে অধিক লাভজনক ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করে ফসল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার বাড়িয়ে ফসলের ১০-১৫ শতাংশ অপচয় রোধ করা যাবে। এছাড়া চাষাবাদে ৫০ শতাংশ সময় এবং ২০ শতাংশ অর্থ সাশ্রয় করা যাবে। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হবে। কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ করে কৃষিকে আরও এগিয়ে যাওয়ার কথা জনকণ্ঠের কাছে তুলে ধরেন কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক। যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি কৃষি খাতের একটি স্বপ্নের প্রকল্প উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষিবান্ধব এ সরকারের মূল লক্ষ্য হলো কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিকীকরণ করা। কৃষিকে অধিকতর লাভজনক করা। সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী গত অর্থবছরে ২০০ কোটি বরাদ্দ দিয়েছিলেন কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য। যার মাধ্যমে হাওড়সহ সারাদেশে ধান কাটার জন্য কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার প্রভৃতি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। কৃষকরা এসব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সফলভাবে বোরো ধান ঘরে তুলেছেন। এই ধারাবাহিকতায় প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়েছে। এই প্রকল্পের ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া যাবে এবং চলতি অর্থবছরটি কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে কৃষিতে এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। সরকার সার ও সেচে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে থাকলেও প্রকল্পের দিক দিয়ে সরকারের এটি সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বলে জানা গেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ অঞ্চলে ৫০ শতাংশ এবং হাওড় অঞ্চলে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া হবে। বড় বড় আধুনিক মেশিনগুলোর দাম কোনটির প্রায় ত্রিশ লাখ টাকার কাছাকাছি। সে হিসেবে মাত্র ৮ থেকে ১৪ লাখ টাকায় একজন কৃষক এই যন্ত্র পাবেন। বাকি টাকা কৃষকদের হয়ে ভর্তুকি দেবে সরকার। প্রকল্পের মাধ্যমে ধান ও গমের জন্য ১৫ হাজার ৫০০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ৪ হাজার রিপার, ২হাজার রিপার বাইন্ডার এবং ৩ হাজার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ৫ হাজার সিডার বা বেড প্লান্টার, ৫ হাজার পাওয়ার থ্রেসার, ৫ হাজার মেইজ শেলার, ৫ হাজার ড্রায়ার যন্ত্র রয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার পাওয়ার স্প্রেয়ার, ৫০০ পাওয়ার উইডার, ৩ হাজার পটেটো ডিগার, ৩০০টি ক্যারেট ওয়াসার এবং ১ হাজার আলুর চিপস তৈরির যন্ত্র কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। এসব যন্ত্র বাবদ খরচ হবে প্রায় ২ হাজার ৫৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যা প্রকল্পের প্রায় ৮৬ শতাংশ।

প্রকল্প নিয়ে জনমনে কিছুটা বিভ্রান্তি এবং বাস্তবতা ॥ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ক্রয় যৌক্তিক হলেও পুরো প্রকল্পে মাত্র ৬১ লাখ টাকার কিছু তৈজসপত্র কেনাকাটা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যা প্রকল্পের মাত্র ০.০২ শতাংশ। একটি বটি বা ড্রামের সর্বোচ্চ মূল্য ডিপিপিতে উল্লেখ থাকার বিষয়ে অনেকেই ক্রয়ে দুর্নীতির কথা বললেও মূলত ভুল বোঝাবুঝির ফলেই এটি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০০-১৫০ মানুষের আবাসিক ডরমিটরিতে এ পণ্যগুলো ব্যবহার হবে যার বাজারমূল্যও অনেকটা কাছাকাছি। আরও জানা গেছে, মূলত ভোক্তার দামের সঙ্গে সরকারী কেনাকাটায় বিশেষ কিছু খরচ যুক্ত থাকার কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হয়। সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটায় ভ্যাট, ট্যাক্স, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মুনাফা যুক্ত থাকে। ফলে এক্ষেত্রে ব্যয় আরও ৩৫-৪০ শতাংশ বা আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ফলে একটি যন্ত্র ভোক্তা যদি বাজার থেকে ১০০ টাকা দিয়ে কিনেন সেই যন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিনতে খরচ হবে আরও অনেক বেশি। যে সকল কৃষককে কয়েক লাখ টাকার যন্ত্র দেয়া হবে তাদের বেশ কিছু দিন এ বিষয়ে আবাসিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো উন্নতমানের কেনা হবে। একাধিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাধারণভাবে বাজারে (বড় সাইজের) বটি সাধারণ ক্রেতা কিনতে গেলে দাম পড়বে মানভেদে প্রায় ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক কেনাকাটায় এর সঙ্গে ভ্যাট ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে খরচ পড়ে ৯ হাজার টাকার বেশি। পানির ড্রাম দামের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। প্রকল্পের ডিপিপিতে সর্বোচ্চ খরচ রাখা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বোচ্চ বরাদ্দের উপরে যাওয়া যাবে না। পণ্যগুলো আগামী দুই থেকে তিন বছর পর কেনা হবে। সামনের দিনে দাম বৃদ্ধি ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করেই তা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, এটা ভুল বোঝাবুঝির ফলে বাসাবাড়িতে ব্যবহার হবে মনে করে অনেকে বিষয়টিকে দুর্নীতির হতে পারে বলছেন। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাছাই করা হলে অবশ্যই যৌক্তিক দামে পণ্য কেনা সম্ভব হবে। এখানে দুর্নীতির কোন সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প যেটা আমাদের কাছে একটি স্বপ্নই। এর মাধ্যকে আমাদের কৃষি অনেক এগিয়ে যাবে। আর মূল খরচ নিয়ে কোথাও কোন প্রশ্ন নেই যেটা হয়েছে সামান্য তৈজসপত্র নিয়ে। আমরা যখন সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক লাখ টাকার একটি যন্ত্র কৃষকদের দিচ্ছি তাদের এই বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার, কিছুটা প্রশিক্ষণ দরকার। নয়তো সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে না কারণ লাখ লাখ টাকার মেশিন কৃষকরা ভালভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না। এজন্য কৃষকদের ১০০ জন বা বেশি গ্রুপ করে বিভিন্ন কৃষি অঞ্চলে আবাসিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে আর সেখানেই এসব ব্যবহার হবে। এটা একটি বাসায় বা দু’চার জনের রান্নায় ব্যবহারের জন্য নয়। তাই বড় ধরনের ভাল মানের পণ্যের দাম মূলত ধরা হয়েছে। আমি নিজেও খোঁজ নিয়েছি বাজারে ভাল আকারের বটি ৫-৬ হাজার টাকার সঙ্গে ভ্যাট ট্যাক্সসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে কাছাকাছি চলে আসে। কিছু জায়গায় যদি বেশি থেকে থাকে তা কারও খরচ করার কোন সুযোগ নেই। আর আরও অধিক খোঁজ নিতে ১টি কমিটি করে দিয়েছি। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ও বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, করোনায় শিল্প ও সেবা খাতের সব কিছু বন্ধ হয়ে গেলেও কৃষির কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। তাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। এই মহামারীতে কৃষিই ছিল একমাত্র ভরসা। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ব্যাপক উদ্যোগ খুবই ভাল। দক্ষতা অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রকল্পটির সঠিক বাস্তবায়ন দরকার। কৃষির স্বার্থে ও প্রকল্প সঠিক বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়ার কথাও বলেছেন অনেকে।

যেসব যন্ত্র মাঠে কাজ করছে ॥ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও ব্যবহার বৃদ্ধি করে ফসলের অপচয় রোধ, চাষাবাদে সময় ও অর্থ রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে পোস্ট হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হবে। এর আগেও সরকারী অর্থায়নে ‘খামার যান্ত্রিকীকরণ-প্রথম পর্যায়’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুনের মধ্যে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এবং পরবর্তীতে জুলাই ২০১৩ থেকে জুন ২০১৯ সালের মেয়াদে প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়ন করা হয়। সে সময় ব্যয় হয়েছিল ৩৩৯ কোটি টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ দক্ষতার সঙ্গে সফলভাবে শেষ হওয়ার পর বড় পরিসরে এমন উদ্যোগ নিল সরকার। সারাদেশে এর আগে কৃষি যন্ত্র দেয়া হয়েছে ৬৮ হাজার ১০৬টি। খামার যান্ত্রিকীকরণের একাধিক কৃষি প্রকৌশলী জানান, কৃষকের খরচ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টার মেশিন। এক মেশিনেই ঘণ্টায় ২ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা যায়। যন্ত্রের মাধ্যমে জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দীও করা যায়। কৃষির সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতেই এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যন্ত্রের দাম বেশি বলেই সরকার ভর্তুকি অর্থ সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ৪ লাখ পাওয়ার টিলার ব্যবহার হচ্ছে যা মোট চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি। ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যবহার হয় কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। এই যন্ত্রের চাহিদা রয়েছে ১ লাখ। তবে দেশে তিন হাজারের কম কম্বাইন্ড হারভেস্টার রয়েছে। আর ধান বীজ বোনার জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের প্রয়োজন দেড় লাখ যা ব্যবহার হচ্ছে ১ হাজারেরও কম। শুধু ধান কাটার যন্ত্র রিপারের চাহিদা ১ লাখ। অথচ দেশে এ যন্ত্র রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। আর ধান বোনার জন্য পিটিও সিডার আছে মাত্র ৫ হাজার আর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ লাখ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ধানের মৌসুমে কম্বাইন্ড হারভেস্টার কৃষকের খুব উপকারী বন্ধু হিসেবে দেখা দেয়। এর সঠিক ব্যবহারে একর প্রতি কৃষি উৎপাদন খরচ ৫ হাজার টাকা থেকে মাত্র দেড় হাজার টাকায় নামিয়ে আনা যায়। একটা কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ বিঘা জমিতে ধান কাটা ও মাড়াই করা সম্ভব। এছাড়াও, ভুট্টা মাড়াইয়ের জন্য মেইজ শেলার কেনা হবে। ধান রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ আলু উত্তোলনের যন্ত্রপাতিও অর্ধেক মূল্যে পাবেন কৃষকরা। এছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ৩০০টি ব্যাচে ৯ হাজার গ্রামীণ মেকানিককে ২৮ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। পাশাপাশি এক হাজার ২০০ জন কর্মকর্তাকে ৪০টি ব্যাচে প্রশিক্ষণ, এক হাজার ব্যাচে এক লাখ যৌথ জমি ব্যবহারকারী কৃষক বা উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ এবং সাড়ে ১২ হাজার জনকে ৫০ ব্যাচে যন্ত্র উপযোগী ধানের চারা উৎপাদন কৌশল সংক্রান্ত পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। সেই সঙ্গে সমন্বিত খামারে এক হাজার ২৪০ মেট্রিক টন বীজ সহায়তা দেয়া হবে। এর বাইরে ১৮টি এটিআই প্রশিক্ষণ ভবন ও ডরমিটরি নির্মাণ, একটি কৃষি যন্ত্রপাতি টেস্টিং ও প্রশিক্ষণ সেন্টারের সুবিধা সৃষ্টি, একটি টেস্টিং শেড নির্মাণ এবং ৩০০টি কৃষি যন্ত্রপাতি উপকরণ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হবে।

অনেকেরই কর্মসংস্থান হবে ॥ সারাদেশেই বিভিন্ন মেশিন সরবরাহ করার কারণে চালক হিসেবে কিংবা রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে অনেকেই কাজের সুযোগ পাবেন। এতে করে অনেক কর্মসংস্থান হবে বলেও জানা গেছে। কৃষক নিজে মেশিন না চালাতে পারলে অপারেটর নিয়োগ দেবেন। সেই সঙ্গে কৃষি যন্ত্র মেরামতের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং সেখানেও অসংখ্য শ্রমিক কাজ করবেন। অনেকেই ভাড়ার মাধ্যমে যন্ত্র পরিচালনা করলেও অনেকের কর্মসংস্থান হবে। এভাবে সারাদেশে অনেক মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলেও জানা গেছে। করোনায় কাজ হারানো কিছু মানুষ এই ক্ষেত্রে উপকৃত হতে পারেন বলেও জানা যায়। এর আগের দুই মেয়াদের স্বল্প পরিসরে নেয়া যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন (আইএমইডি) বিভাগ দুই শতাধিক উপকারভোগীর তথ্য নিয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেখানে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কর্মসংস্থানের চিত্র। আইএমইডি ওই প্রতিবেদনে বলছে, ৯০.৬০ শতাংশ কৃষক মনে করেন কর্মসংস্থান বেড়েছে। ৭১.৪০ শতাংশ কৃষকের মতে কৃষি যন্ত্রপাতি অপারেটরের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ৫৭.০৮ শতাংশ কৃষকের মতে কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ৫৩.২৪ শতাংশ কৃষকদের মতে স্বল্প মূল্যে যন্ত্রপাতি ভাড়ার প্রসার ঘটেছে এবং ২৪.৪১ শতাংশ কৃষক মনে করেন ডিলারের ব্যবসায় প্রসার হয়েছে। আর বর্তমানে সরকারের আরও বেশি বিনিয়োগ হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে কয়েকগুণ বেশি কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছে।

কৃষির বাণিজ্যিক নিয়ে যে সম্ভাবনা তা আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানুষের হাত ধরে সফল বাস্তবায়নে কৃষি পৌঁছাবে আরও অনেক উপরে সেই সঙ্গে ভূমিকা রাখবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়।